হজরত খাদিজা (রা.) এর মৃত্যুতে রাসুল (সা.) খুবই ভেঙে পড়েন। সবসময় তিনি ভারাক্রান্ত মনে দিন যাপন করতেন। এ অবস্থা দেখে নবীজির আত্মীয়স্বজন খুব চিন্তিত হয়ে পড়েন। এ সময় হজরত উসমান ইবনে মাজউন (রা.) এর স্ত্রী হজরত খাওলা বিনতে হাকিম (রা.) নবীজির খেদমতে হাজির হন। রাসুল (সা.) হজরত খাদিজা (রা.) এর বিয়োগে অত্যন্ত ব্যথিত ছিলেন। তার মনের অবস্থা বুঝতে পেরে হজরত খাওলা বিনতে হাকিম (রা.) নবীজিকে দ্বিতীয়বার বিয়ে করার পরামর্শ দেন। হজরত খাদিজা (রা.) সংসারের যাবতীয় কাজ ও ছেলেমেয়েদের দেখাশোনা করতেন। সুখে-দুঃখে সব কাজে রাসুল (সা.) এর সহযোগিতা করতেন। তাই হজরত খাদিজা (রা.) এর ইন্তেকালে সংসারটা যেন এলোমেলো হয়ে গেল। এদিকে ছেলেমেয়েদের দেখাশুনা করার মতো কেউ নেই। তাই হুজুর (সা.) সম্মতি দিলেন। প্রিয়নবীর সম্মতি পেয়ে হজরত খাওলা বিনতে হাকিম হজরত সাওদা (রা.) এর বাবার কাছে গিয়ে জানালেন, তিনি নবীজির সঙ্গে হজরত সাওদা (রা.) এর বিয়ের পয়গাম নিয়ে এসেছেন। সব কথা শুনে হজরত সাওদার বাবা খুশি হলেন। কারণ, রাসুল (সা.) শুধু নিজেই শ্রেষ্ঠ মানুষ, শ্রেষ্ঠ পয়গম্বর ছিলেন না বরং তার বংশও ছিল আরবের শ্রেষ্ঠ বংশ। তিনি মেয়ের মতামত নিয়ে রাজি হয়ে গেলেন। সব কথা পাকাপাকি হলে নবুয়তের দশম বছর শাওয়াল মাসে নবীজির সঙ্গে হজরত সাওদা (রা.) এর বিয়ে সম্পন্ন হয়। এ বিয়েতে ৪০০ দিরহাম মোহরানা ধার্য করে বিয়ের কার্য শেষ হয়।
উম্মুল মুমিনিন হজরত সাওদা (রা.) এর বাবার নাম হজরত জাময়া ইবনে কায়েস ইবনে আবদে শামস (রা.)। আর মার নাম হজরত শমুস বিনতে কায়েস ইবনে জায়েদ (রা.)। হজরত সাওদা (রা.) এর মা-বাবা মক্কার অধিবাসী ছিলেন। রাসুল (সা.) এর সঙ্গে বিয়ের আগে হজরত সাওদা বিনতে জাময়া (রা.) ছিলেন বিধবা। তার প্রথম বিয়ে হয় চাচাতো ভাই হজরত সাকরান ইবনে আমর (রা.) এর সঙ্গে। ইসলামের প্রাথমিক যুগেই হজরত সাওদা (রা.) এবং হজরত সাকরান (রা) একই সঙ্গে ইসলাম গ্রহণ করেন। তারপর তারা পৌত্তলিকদের নির্যাতন থেকে বাঁচার জন্য আবিসিনিয়ায় পালিয়ে যান। আবিসিনিয়া থেকে ফিরে এসে হজরত সাকরান (রা.) ইন্তেকাল করেন। আর স্ত্রীকে রেখে যান অত্যন্ত অসহায় অবস্থায়।
রাসুল (সা.) এর সঙ্গে বিয়ের পর হজরত সাওদা বিনতে জাময়া (রা.) নবীজির সংসার অত্যন্ত আন্তরিকতার সঙ্গে দেখাশোনা করতেন। হজরত খাদিজা (রা.) এর ইন্তেকালে নবী সংসারে যে এলোমেলো অবস্থা সৃষ্টি হয়, তিনি তা আবার স্বাভাবিক পর্যায়ে নিয়ে আসেন। পুরো সংসারটা তিনি একাই দেখাশোনা করতেন। হজরত খাদিজা (রা.) এবং নবীজির চাচা আবু তালেবের মৃত্যুতে মক্কার কাফেররা রাসুল (সা.) এর সঙ্গে খুবই নিষ্ঠুর ব্যবহার করত। হজরত সাওদা (রা.) তা মর্মে মর্মে উপলব্ধি করতেন এবং নবীজির দুঃখ মোচনে সবসময় যতœবান হতেন। তিনি নবীকন্যা হজরত উম্মে কুলসুম (রা.) ও হজরত ফাতেমা (রা.) কে সর্বদা হাসি-আনন্দে রাখার চেষ্টা করতেন। কারণ, তারা ছিলেন বয়সে খুব ছোট। মা-হারা হয়ে তারা কান্নাকাটি করে মন খারাপ করে এক কোণে বসে থাকতেন। তাই তিনি সবসময় তাদের দেখাশোনা করতেন। রাসুল (সা.) এর দুই ছেলে আবুল কাশেম ও আবদুল্লাহ ছোটকালেই ইন্তেকাল করেন। আর হজরত জয়নব (রা.) এবং হজরত রুকাইয়া (রা.) বিয়ের পর স্বামীগৃহে চলে যান।
উম্মুল মুমিনিন হজরত সাওদা (রা.) কে বিয়ে করার মাত্র ১৫ দিন পর প্রিয় নবীজি (সা.) হজরত আয়শা (রা.) কে বিয়ে করেন। তখন তিনি মাত্র ছয় বছরের বালিকা। বিয়ের পর হজরত আয়শা (রা.) রাসুল (সা.) এর ঘরে আসার আগে তিন বছর পিতৃগৃহে ছিলেন। এ তিন বছর হজরত সাওদা (রা.) রাসুল (সা.) এর একমাত্র স্ত্রী হিসেবে সংসার দেখাশোনা করেন। হজরত আয়শা (রা.) এর বয়স ছিল খুবই অল্প, তাই তিনি নবীজির সংসারে আসার পর সংসার-কাজকর্ম কিছুই বুঝতেন না। হজরত সাওদা (রা.) তাকে সাংসারিক ব্যাপারে অনেক পরামর্শ ও সাহায্য-সহযোগিতা করতেন। হজরত সাওদা (রা.) ও হজরত আয়শা (রা.) এর বয়সের মধ্যে বলতে গেলে আকাশ-পাতাল তফাৎ ছিল। তবুও সুসম্পর্কের কারণে তাদের মধ্যে সরস মধুর ব্যবহার ও হাসি-ঠাট্টার অবতারণা হতো, যাতে রাসুল (সা.) এর সংসারে অনাবিল বেহেশতি খুশির ধারা নেমে আসত। তাই হজরত সাওদা (রা.) সম্পর্কে হজরত আয়শা বলেছেন, ‘আমি শুধু একজন মহিলার কথাই জানি, যার অন্তরে হিংসার ছোঁয়া মোটেই পড়েনি। আর তিনি হলেন সাওদা।’ নবীজির পবিত্র সাহচর্য লাভের ফলে হজরত সাওদা (রা.) এর মাঝে উদারতা এবং দানশীলতার অপরূপ সমন্বয় ঘটেছিল। নবীজি (সা.) এর মতো হজরত সাওদা (রা.) এর মনও দয়ায় ভরপুর ছিল।
রাসুল (সা.) এর ওফাতের পর, তখন হজরত ওমর (রা.) এর শাসনকাল। একদিন হজরত ওমর (রা.) এক বাহককে দিয়ে হজরত সাওদা (রা.) এর জন্য একটি থলে পাঠালেন। থলেটি ছিল দিরহামে ভরা। তিনি বাহককে জিজ্ঞেস করলেন, ‘থলেতে কি আছে?’ উত্তরে বাহক বললেন, ‘দিরহাম’। হজরত সাওদা (রা.) বললেন, থলেটি দেখতে ঠিক খেজুরের থলের মতো। খেজুরের থলেতে কি দিরহাম থাকতে পারে? এ কথা বলে তিনি খেজুরের মতো সব দিরহাম অভাবগ্রস্তদের মধ্যে বিলিয়ে দিলেন। তিনি নবীজির খুব অনুগত ছিলেন এবং তার কথামতো সব কাজ করতেন।
হজরত সাওদা (রা.) ছিলেন খুবই স্বাস্থ্যবতী, সুন্দরী ও দীর্ঘাঙ্গিনী। তিনি অল্প কথা বলতেন, তীক্ষè বুদ্ধি-সম্পন্না ছিলেন। তবে তার মেজাজ ছিল একটু কড়া। কোনো কোনো সময় মামুলি ব্যাপারে রাগ করে বসতেন। কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে আবার তার মধ্যে হাসি-কৌতুকের পবিত্র ফোয়ারা বয়ে যেত। অনেক সময় তিনি বিভিন্ন কথা দিয়ে নবীজিকে হাসাতেন। একবার তিনি রাসুল (সা.) কে বলেন, গতরাতে আমি আপনার পেছনে নামাজ পড়েছি; কিন্তু আপনি রুকুতে এত দেরি করেছেন যে, আমার নাক ফেটে যেন রক্ত না বের হয়, সে জন্য আমি নাক চেপে ধরেছিলাম। হুজুর (সা.) তার কথা শুনে মৃদু হাসলেন।
হজরত সাওদা (রা.) এর আগের স্বামীর ঔরসজাত এক পুত্রসন্তান ছিলেন। নাম তার আবদুর রহমান। হজরত ওমর (রা.) এর শাসনামলে সালাতার যুদ্ধে কাফেরদের বিরুদ্ধে বীরত্বের সঙ্গে যুদ্ধ করে শহীদ হন। হজরত সাওদা (রা.) পাঁচটি হাদিস বর্ণনা করেন। উম্মুল মুমিনিন হজরত সাওদা বিনতে জাময়া (রা.) ২২ হিজরি সনে হজরত ওমর (রা.) এর খেলাফতের শেষের দিকে ইন্তেকাল করেন। তাকে জান্নাতুল বাকিতে দাফন করা হয়।
Subscribe to:
Post Comments (Atom)
উম্মুল মুমিনিন জয়নব বিনতে জাহাশ রাদিয়াল্লাহু আনহা
উম্মুল মুমিনীন সাইয়্যিদাতুন নিছায়িল আলামীন সাইয়্যিদাতুনা হযরত জয়নব বিনতে জাহাশ আলাইহাস সালাম উনার পবিত্র শানে উম্মুল মুমিনীন ...
উম্মুল মুমিনীন ছিদ্দিকা আলাইহাস সালাম
-
এক নযরে উম্মাহাতুল মুমিনীন, রাসূল (ছাঃ)-এর স্ত্রীগণ : 30 de maio de 2012 às 06:09 ১. হযরত খাদীজাতুল কুবরা বিনতে খুওয়াইলিদ : বিব...
-
উম্মাহাতুল মুমিনীন মুহাদ্দিসিন ও ঐতিহাসিকরা এ বিষয়ে একমত যে, উম্মাহাতুল মুমিনিনের সংখ্যা ১১ জন। এর অধিক সং...
-
উম্মুল মুমিনিন (বিশ্বাসীদের মাতা) আয়িশা স্থানীয় নাম ( আরবি ): عائشة জন্ম আয়িশাহ বিনতে আবু বকর আনুমানিক ৬১৩/৬১৪ খ্রিষ...
No comments:
Post a Comment