নবীজির জীবন আর তার দৃষ্টিকোণ থেকে আমরা তার চারপাশের লোকদের সম্পর্কে জানি। এটা সঙ্গত কারণেই ঘটে। তবুও আমরা উপকৃত হবো যদি রাসূলের সাহাবাদের ব্যপারে আলাদা করে ব্যক্তি হিসেবে জানা যায়। তাদের উদ্দেশ্য করেই আল্লাহ বলেন,
“সবচেয়ে উত্তম জাতি যাদের মানুষের জন্য আদর্শ হিসেবে বের করা হয়েছে।” আলে ইমরানঃ ১১০
বিশেষত নবীজির পূণ্যবতী এবং সম্মানিত স্ত্রীদের সম্পর্কে জানা খুব জরুরি। যাতে বুঝতে পারি তারা ও সাধারণ মানুষই ছিলেন, এ দুনিয়ায় জীবন যাপন করেছেন, খেয়েছেন, হেসেছেন এবং নবীজিকে সন্তুষ্ট রাখতে সচেষ্ট ছিলেন।
নবীজির পর উম্মাহাতুল মুমিনীন এর চাইতে অনুকরণীয় আর কারা হতে পারেন, যাদের জান্নাতের ওয়াদা করা হয়েছে। আমাদের চলতি সফরে আমরা জেনে নিব আমাদের মুমিনদের মাতাগণ কেমন ছিলেন? হাসিখুশি – সংবেদনশীল, বহির্মুখী-অন্তর্মুখী, দ্বিধাগ্রস্ত নাকি ভীতিহীন। এখানে আমরা নবীজির স্ত্রী মাইমুনা বিনতে হারিছ সম্পর্কে জানব। নবীজির স্ত্রীদের মধ্যে মাইমুনা ছিলেন দৃঢ় প্রতিজ্ঞ, বিশ্বস্ত এবং অমায়িক।
দৃঢ় প্রতিজ্ঞ মায়মুনা
মায়মুনা জানতেন তিনি ঠিক কি চান এবং সে বিষয় পেতে তিনি চেষ্টা করতেন। তালাকপ্রাপ্ত বিধবা হবার পর তিনি বুঝতে পারলেন তার একজন সঙ্গী দরকার। আর নবীজির চাইতে ভাল সঙ্গী আর কে হতে পারেন? তাই মায়মুনা নবীজিকে বিয়ে করার আগ্রহ দেখালেন।
উম্মুল ফদলের কাছে গিয়ে মায়মুনা নবীজিকে বিয়ে করার আকাঙ্ক্ষার কথা খুলে বললেন। তিনি জানতেন এতে কাজ হবে। এবং কাজ হলো। উম্মুল ফাদল আব্বাসের কাছে মাইমুনার আগ্রহের কথা বললেন। আব্বাস মায়মুনার বিবাহের প্রস্তাব রাসূলের কাছে পৌছে দিলেন। নবীজি তার প্রস্তাব কবুল করলেন। মাইমুনা এ আশায় বসে থাকেননি যে কেউ এসে তাকে বিয়ের প্রস্তাব দিবে বরং সর্বশ্রেষ্ঠ মানুষকে সবচেয়ে কাছে পাওয়ার সত্যিকার বাসনা থেকে তিনি নিজেই নিজের সিদ্ধান্ত নিলেন।
এরকমই এক ঘটনা। মাইমুনা প্রায়ই টাকা ধার করতেন। একবার তিনি বেশি পরিমাণ অর্থ ধার করেছিলেন। কেউ তাকে জিজ্ঞাসা করল, কিভাবে এ দেনা শোধ করবেন? তিনি জবাব দিলেন নবীজি বলেছেন
‘যদি কেউ দেনাশোধের ইচ্ছা রাখে তবে আল্লাহ নিজেই এ দেনাশোধ এর ব্যবস্থা করবেন।’
এটাই হয়ত মাইমুনার দৃঢ় প্রতিজ্ঞার উৎস । তিনি জানতেন তিনি দুনিয়া-আখেরাতের কল্যাণ চান। আলাহর উপর তাওয়াক্কুল করেছিলেন এবং দুনিয়া-আখেরাতে যা তার জন কল্যাণকর তার জন্য চেষ্টা করে গেছেন।
বিশ্বস্ত মায়মুনা
আয়েশা রাঃ বলেন,
‘আমাদের মধ্যে তিনিই {মায়মুনা} ছিলেন সবচেয়ে মুত্তাকী এবং আত্মীয়তার সম্পর্ক টিকিয়ে রাখতে সবচেয়ে সচেষ্ট।’ আয়েশা রাঃ বলেন, ‘মাইমুনা ছিলেন নেককার, মুত্তাকী এবং আত্মীয়দের সাথে আচরণের ক্ষেত্রে সুবিবেচক। তিনি মসজিদে নববীতে নামায পড়তেন কেননা তিনি শুনেছিলেন মসজিদে নববিতে নামায আদায় অন্য মসজিদে নামায আদায়ের তুলনায় হাজার গুণ ভাল, তবে মসজিদে হারামের ক্ষেত্রে এটা এক লক্ষ রাকাত নামাযের সমতুল্য। আয়েশা রাঃ তার সতীন সম্বন্ধে দু’বার রেওয়াত করেছেন যে, তিনি তার আত্মীয়দের সাথে সম্পর্ক বজায় রাখতে খুব আগ্রহী ছিলেন।
কুরাইশ গোত্রের সদস্য হিসেবে মদিনা হিজরতের পরেও পরিবারের অন্য সবার সাথে আত্মীয়ের সম্পর্ক বজায় রাখতেন এমনকি যারা মক্কাতে থেকে গেছে তাদের সাথেও তার যোগাযোগ ছিল। মুসলিম-অমুসলিম, কাছের –দূরের নির্বিশেষে সবার ক্ষেত্রে শুধু বিশ্বস্তই ছিলেননা, তিনি শরিয়ার প্রতিও অনুগত ছিলেন।
‘আর আল্লাহকে ভয় কর, যার নামে তোমরা একে অপরেরর কাছে যাচনা কর এবং আত্মীয়দের ব্যাপারে সতর্কতা অবলম্বন কর।’ (সূরা আন নিসাঃ ১)
অমায়িক মাইমুনা
বিয়ের পর মসজিদে নববির পাশে একটা ঘর দেয়া হয়েছিল মাইমুনাকে। উম্মাহাতুল মুমিনীন সকলে তাকে স্বাগত জানান। তারা মাইমুনার প্রতি সহনশীল ছিলেন। মাইমুনাও তাদের প্রতি ভালবাসা আর সহনশীলতা পোষণ করতেন। বিভিন্ন উৎস থেকে পাওয়া তথ্যে জানা যায় কখনো সতীনদের সাথে তার ঝগড়া-বিবাদের ঘটনা ঘটেনি।
মাইমুনা ব্যাপারে খুব বেশি বর্ণনা পাওয়া যায়না। হয়ত তাদের বিয়ের তিন বছর পর নবীজি ইন্তেকাল করেছিলেন এ কারণেই এরকম ঘটেছে। দ্বিতীয়বারের মত বিধবা হবার কালে তিনি আসলেই নব-বিবাহিত ছিলেন। আশি বছর জীবিত ছিলেন কিন্তু নবীজির সাথে বিবাহের বাইরে খুব কম জানা যায় তার ব্যপারে। তবে নবীজির সাহাবী এবং স্ত্রী হিসেবে তার ব্যাপারে যা জানতে পারি তা থেকে মনে হয় তিনি ছিলেন বিশ্বস্ততা, অমায়িকতা এবং দৃঢ়প্রতিজ্ঞ মানুষের অত্যুজ্জ্বল উদাহরণ।
No comments:
Post a Comment